জিল্যান্ডিয়া কি সত্যিই একটি মহাদেশ?

আজ আপনাদের একটা সহজ প্রশ্ন করি। বলুন তো পৃথিবীতে মহাদেশের সংখ্যা কয়টি? আমি জানি এ প্রশ্নের উত্তরে সবাই হাসতে হাসতে নির্দিধায় বলে দিবেন ৭টি। উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ,ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া। ও হ্যাঁ এন্টার্কটিকা আছে। আমরা মহাদেশগুলো বলতে তো এগুলোর নামই শুনে আসছি। কিন্তু আজ আমি আলোচনা করব পৃথিবীর অষ্টম মহাদেশ সম্পর্কে। হ্যাঁ, সম্প্রতি আবিষ্কৃত হওয়া পৃথিবীর অষ্টম মহাদেশ জিল্যান্ডিয়া সম্পর্কে।


জিল্যান্ডিয়া মহাদেশটি অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের পার্শবর্তী রাষ্ট্র নিউজিল্যান্ডকে ঘিরেই অবস্থিত। জিল্যান্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ ৮.৫ থেকে ১৩ কোটি বছর আগে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল অ্যান্টার্কটিকা থেকে। আর ৬ থেকে ৮.৫ কোটি বছর আগে জিল্যান্ডিয়া বিচ্ছিন্ন হয় অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ থেকেও। এরপর ক্রমশ এটি পানিতে নিমজ্জিত হতে থাকে। ধারণা করা হয়, ২.৩ কোটি বছর আগে সম্পূর্ণ মহাদেশটিই পানিতে নিমজ্জিত ছিল।

বর্তমানে মহাদেশটির প্রায় ৯৪ শতাংশ রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে নিমজ্জিত। ভূবিজ্ঞানীদের মতে, নিউজিল্যান্ড মূলত এই মহাদেশেরই জেগে থাকা অংশ। কিংবা একে বলা যেতে পারে এই মহাদেশের পর্বতচূড়াও। এছাড়া এই মহাদেশের জেগে থাকা অংশের মধ্যে আরো রয়েছে নিউ ক্যালেডোনিয়া, নরফক আইল্যান্ড, লর্ড হোয়ে আইল্যান্ড এবং এলিজাবেথ ও মিডলটন প্রবালপ্রাচীর।


জিল্যান্ডিয়া নিয়ে ভূবিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। তবে এটিকে নিয়ে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয় ২০১৭ সালে, যখন 'জিওলজিক্যাল সোসাইটি অভ আমেরিকা'য় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে বলা হয়, জিল্যান্ডিয়ার আয়তন পঞ্চাশ লক্ষ বর্গকিলোমিটারের কাছাকাছি, যা পার্শ্ববর্তী অস্ট্রেলিয়ার প্রায় দুই তৃতীয়াংশের সমান, এবং ভারতীয় উপমহাদেশেরও প্রায় সমান। সম্ভবত গন্ডওয়ানা থেকে এটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।



অনেকেরই মনে হতে পারে, যেহেতু জিল্যান্ডিয়া সিংহভাগ অংশ পানির নিচে নিমজ্জিত, তাই এটির মহাদেশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই; কেননা পানির উপরে অবস্থিত হওয়া মহাদেশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটি আসলে ভুল ধারণা। ভূবিজ্ঞানীরা প্রমাণ দিয়েছেন যে, জিল্যান্ডিয়ার মধ্যে একটি মহাদেশ হওয়ার মতো সকল গুণই বিদ্যমান। 



জিল্যান্ডিয়া নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমেরিকান ভূপ্রকৃতিবিদ ব্রুস লুয়েনডিক জিল্যান্ডিয়া নামটিকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করেন, এবং এটিকে পৃথিবীর সম্ভাব্য অষ্টম মহাদেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের মডেল দাঁড় করান। 

২০০২ সালে ব্যাথিমেট্রিক মানচিত্র প্রণয়নের মাধ্যমে গবেষকরা অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং সমুদ্রেপৃষ্ঠের মাধ্যাকর্ষণ মানচিত্রের মাধ্যমে তাঁরা সফলভাবে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে জিল্যান্ডিয়া একটি বিশাল অঞ্চলজুড়ে ব্যাপ্ত, সমন্বিত ভূখণ্ডও বটে।


বৈজ্ঞানিকভাবে না হয় প্রমাণ করা গেছে যে জিল্যান্ডিয়া একটি মহাদেশ, কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে কি এটিকে একটি পৃথক মহাদেশ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে? না, এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী খুব কম দেশের পাঠ্যপুস্তকেই মহাদেশ হিসেবে জিল্যান্ডিয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।



অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, হয়তো পাঠ্যপুস্তক রচয়িতারা কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করে আছেন। কিন্তু বাস্তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ভূখণ্ডকে মহাদেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক ফোরাম বা সংস্থারই অস্তিত্ব নেই। তাই জিল্যান্ডিয়া পৃথিবীর অষ্টম মহাদেশ কি না, সেটি কোনো ফোরামের ঘোষণার উপর নির্ভরশীল নয়। বরং এটিকে সময়ের উপরই ছেড়ে দিতে হবে এবং জিল্যান্ডিয়া যে একটি মহাদেশ এটি যখন সার্বজনীন জ্ঞানে পরিণত হবে, তখন হয়তো জিল্যান্ডিয়ার নামও উঠে আসবে পাঠ্যপুস্তকের পাতায়।



বন্ধুরা, পৃথিবীর অষ্টম মহাদেশ জিল্যান্ডিয়া সম্পর্কে আপনারা কি ভাবছেন। জিল্যান্ডিয়াকে কী অষ্টম মহাদেশ হিসেবে সার্বজনীন স্বীকৃতি দেয়া যায়? তা কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে জানিয়ে দিন।