বাংলাদেশের গর্ব বিশ্ববিজ্ঞানী ড. জামাল নজরুল ইসলাম

অধ্যাপক ড. জামাল নজরুল ইসলাম খ্যাতনামা বাংলাদেশি বিজ্ঞানী । মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন তিনি। ষ্টিফেন হকিংসহ আরও অনেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু ও সহকর্মী।
তাঁর লেখা গবেষণায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলো আরেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী ফ্রিম্যান ডাইসন।

মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে। সেই প্রসারণের খোঁজ নিতে গিয়েই বিগব্যাং তত্ত্বের জম্ন হয়। এ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়, এখনো সে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি কী হতে পারে,
সেটা নিয়ে খুব বেশি বিজ্ঞানী সেকালে মাথা ঘামাননি।
এই কাজটি করেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম।
তখন এ কাজটি কিন্তু সহজ ছিল না। তখনো তড়িৎ মহাবিশ্বের বিষয়টি আসেনি কসমোলজিতে।

আবার হয়েল-নারলিকরের স্টেডি ষ্টেট থিওরি বা স্থির মহাবিশ্বের ধারণা পুরোপুরি বাতিল হয়নি।
মহাবিশ্বের আকার সমতল, প্যারাবলিক নাকি আবদ্ধ সে সম্পর্কেও নিশ্চিত কোনো ধারণা ছিল না।
তাই সব মিলিয়ে মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি নিয়ে কাজ করাটাই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
জামাল নজরুল ইসলাম সেই ঝুঁকিটা নিয়েছিলেন।
লিখেছিলেন তাঁর কালজয়ী বই আল্টিমেট ফেট অব দ্য ইউনিভার্স।
বিখ্যাত কসমোলজিস্ট ফ্রিম্যান ডাইসন পর্যন্ত তাঁর বই পড়ে অনুপ্রানিত হয়েছিলেন।

জন্ম ও শৈশবঃ
জামাল নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারিতে। জন্মস্থান ঝিনাইদহ হলেও তার শিকড়ের ঠিকানা চট্টগ্রামে। চাকরিসূত্রে বাবা ঝিনাইদহ অবস্থান করছিলেন বলে জন্মস্থান হয়েছে সেখানে। বংশগত দিক থেকে ছিলেন অভিজাত পরিবারের সন্তান, তৎকালে ঢাকার নবাব বাড়ির পাশাপাশি যোগাযোগ ছিল জর্ডানের বাদশার পরিবারের সাথে। তবে বংশ হিসেবে অভিজাত হলেও ছিল না অভিজাত্যের অহংকার।

শিক্ষাঃ
শৈশবে কলকাতার একটি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন জামাল নজরুল ইসলাম। সেখান থেকে আসেন চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তির সময় তার মেধা দেখে অভিভূত হন প্রধান শিক্ষক। মেধায় মুগ্ধ হয়ে তাকে ডাবল প্রমোশন দিয়ে তুলে দেন ষষ্ঠ শ্রেণীতে। এখানে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে চলে যান পাকিস্তানের লরেন্স কলেজে। লরেন্স কলেজ থেকে এ লেভেল এবং ও লেভেল সম্পন্ন করে ভর্তি হন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। সেখান থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বি.এসসি অনার্স সম্পন্ন করেন। তারপর চলে যান লন্ডনের বিশ্ববিখ্যাত ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে কৃতিত্বের সাক্ষর রেখে ১৯৬৪ সালে ‘এপ্লায়েড ম্যাথম্যাটিকস এন্ড থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স’-এর উপর পিএইচ.ডি সম্পন্ন করেন তিনি।

শিক্ষা ও ডিগ্রি অর্জনের ব্যাপারগুলো ঘটে যাচ্ছিল খুব দ্রুত। ২০ বছর বয়সেই তিনি দু’বার বি.এসসি করে ফেলেন (লন্ডনের ট্রিনিটি কলেজে ২য় বার বি.এসসি করেছিলেন)। ছোটবেলায় যেমন ডাবল প্রমোশন পেয়ে সিক্সে ওঠে গিয়েছিলেন তেমনই পোস্ট ডক্ট্ররাল করার সময়ও ‘ডাবল প্রমোশন’ পেয়েছিলেন। ডক্টরেট সম্পন্ন হবার আগেই পোস্ট ডক্টরাল গবেষণায় যোগ দেন তিনি। সাধারণত ডক্টরেট সম্পন্ন হবার আগে পোস্ট ডক্টরেট গবেষণা করা যায় না। কিন্তু তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই পিএইচ.ডির কাজ শেষ করে ফেলেন। কাজ সম্পন্ন হয়ে গেলেও থিসিস জমা দেবার সময় না হওয়াতে পিএইচ.ডি সম্পন্ন হতে দেরি হয় তার। তাই তিনি বিশেষ বিবেচনায় পোস্ট ডক্টরাল গবেষণার সুযোগ পেয়েছিলেন।

বই ও গবেষণাঃ
জামাল নজরুল ইসলাম বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য বই লিখেছেন ৬টি। তবে বই, গবেষণা ও সম্পাদনার বিস্তারিত তালিকা করলে তা অনেক দীর্ঘ হবে। এদের মাঝে ৩টি বই বিশ্ববিখ্যাত। ক্যামব্রিজ ও হার্ভার্ড সহ বেশ কয়েকটি নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বই পাঠ্য হিসেবে পড়ানো হয়। তার বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বই হচ্ছেঃ
১) দি আল্টিমেট ফেইট অফ দি ইউনিভার্স (১৯৮৩) - কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর বিজ্ঞানী মহলে বিশেষ সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়। জাপানি, ফরাসি, পর্তুগিজ ও যুগোশ্লাভ ভাষায় অনূদিত হয়।
২) ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি (১৯৮৪) - ডব্লিউ বি বনোর এর সাথে যৌথভাবে সম্পাদনা করেন।
৩) রোটেটিং ফিল্ড্‌স ইন জেনারেল রিলেটিভিটি (১৯৮৫) - কেমব্রিজ থেকে প্রকাশিত।
৪) অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি (১৯৯২)
৫) কৃষ্ণ বিবর - বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত।
৬) মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ - রাহাত-সিরাজ প্রকাশনা
৭) শিল্প সাহিত্য ও সমাজ - রাহাত-সিরাজ প্রকাশনা
৮) স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ - কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস। স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত
৯) দ্য ফার ফিউচার অফ দি ইউনিভার্স - এনডেভারে প্রকাশিত

২০১৩ সালের ১৬ই মার্চ ৭৪ বছর বয়সে মহান এই বিজ্ঞানী মৃত্যুবরণ করেন।