প্যালিনড্রোম রহস্যঃ সংখ্যা ও শব্দের জাদু!

আজ ০২-০২-২০২০ রোজ রবিবার। আজ এমন একটি তারিখ এসেছে যা কিনা ৮ সংখ্যার একটি প্যালিনড্রোম। প্যালিনড্রোম আসলে কি? কখন একটি সংখ্যাকে প্যালিনড্রোম বলা হয়? আপনি জানেন কি প্যালিনড্রোম শুধু সংখ্যা নয়, বরং শব্দ, বাক্য এমনকি কবিতাও হতে পারে! চলুন এক নজরে জেনে আসি প্যালিনড্রোমের সকল ইতিহাস!

যদি বিশেষ কিছু শব্দ বা সংখ্যাকে শুরু বা শেষ দুদিক থেকে পড়লেই শব্দের উচ্চারণ আর অর্থের কোন বদল না হয়, বা সংখ্যার ক্ষেত্রে মান একই থাকে তবে তাকে প্যালিনড্রোম (ইংরেজি: Palindrome) বলা হয়। ইংরেজি প্যালিনড্রোম শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ প্যালিনড্রোমাস(অর্থ: Running back again) থেকে। καρκινικός, বাংলা ভাষায় একে দ্বিমুখী শব্দ বা সংখ্যা বলা যায়।

বিংশ শতাব্দীতে ১৯৯১ সাল ছিল একমাত্র প্যালিনড্রোমিক। বর্তমান শতাব্দীতে একমাত্র প্যালিনড্রোমিক সাল হল ফেলে আসা ২০০২ সালটি। আর পরবর্তী শতাব্দীতে  প্যালিনড্রোমিক বছর হবে ২১১২ সাল। আবার আমরা যদি দিন, মাস ও বছর একত্রে হিসাব করে আট সংখ্যার তারিখ খুঁজে দেখি তাহলে বর্তমান শতাব্দীতে পাওয়া যাবে কুড়িটি প্যালিনড্রোমিক তারিখ যার প্রথমটি ছিল ১০.০২.২০০১। এরপর একে একে পার হয়ে গেছে ২০.০২.২০০২, ১১.০২.২০১১ ও ২১.০২.২০১২। আর আগামী বছরগুলিতে আট সংখ্যার প্যালিনড্রোমিক তারিখ আছে ১২.০২.২০২১, ২২.০২.২০২২, ১৩.০২.২০৩১, ২৩.০২.২০৩২, ১৪.০২.২০৪১, ২৪.০২.২০৪২, ১৫.০২.২০৫১, ২৫.০২.২০৫২, ১৬.০২.২০৬১, ২৬.০২.২০৬২, ১৭.০২.২০৭১, ২৭.০২.২০৭২, ১৮.০২.২০৮১, ২৮.০২.২০৮২, ১৯.০২.২০৯১ এবং ২৯.০২.২০৯২। সুতরাং এই শতাব্দিকে আট সংখ্যার তারিখের ভিত্তিতে প্যালিনড্রোম তারিখ সমৃদ্ধ বলা যায়। বিগত এক হাজার বছরে আমরা শেষ যে আট সংখ্যার প্যালিনড্রোম তারিখটি পেয়েছি সেটা হচ্ছে - ২৯.১১.১১৯২।


গণিতে প্যালিনড্রোমঃ

অবাক করা বিষয় হচ্ছে গণিতে প্যালিনড্রোমিক সংখ্যার কিন্তু কোন অভাব নেই! যে কেউ চাইলেই হাজার হাজার প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা তৈরি করতে পারবে। যেমন ১১, ২২, ১২১, ২৩২, ২৪৪২, ১২৩২১ ইত্যাদি। তবে যে কোনও অ-প্যালিনড্রোমিক সংখ্যাকেও সহজ অ্যালগোরিদম পদ্ধতিতে (নির্দেশমত সুনির্দিষ্ট ধাপে) প্যালিনড্রোমিক সংখ্যায় পরিণত করা যায়। যেমন ধরি, একটি সংখ্যা হল ৪৮। এবার সংখ্যাটিকে উল্টে দিলে নতুন পাওয়া সংখ্যাটি হয় ৮৪। এবার এই দুটি সংখ্যা যোগ করে পাওয়া যায় (৪৮+৮৪)=১৩২। একেও উল্টে দেওয়া হলে পাওয়া যাবে ২৩১। আবার এই দুটি সংখ্যা যোগ করলে যোগফল হয় (১৩২+২৩১)=৩৬৩। যা একটি প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা। এভাবে যেকোন সংখ্যাকে যদি এই নিয়মে পরপর যোগ করা হয় তবে একসময় প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা পাওয়া যাবে।  এখন পর্যন্ত এই নিয়মে সবচেয়ে দেরিতে যে সংখ্যাটির প্যালিনড্রোম পাওয়া গেছে  তা হল ১,১৮৬,০৬০,৩০৭,৮৯১,৯২৯,৯৯০ । ২৬১ ধাপে প্রক্রিয়াটি চালানোর পর এটি একটি প্যালিনড্রোমে পরিণত হয়।

এছাড়াও গণিতে মজার মজার প্রচুর প্যালিনড্রোমিক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। যেমন ৯ সংখ্যাটির প্যালিনড্রোমিক ম্যাজিক কিন্তু সত্যি আকর্ষণীয়। ৯-এর সকল গুণিতককে (যেমন ০,৯,১৮,২৭,.... ৯০) পর পর পাশাপাশি লেখা হলে তা কিন্তু লম্বা একটা প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা হয়ে যাবে। সংখ্যাটি হচ্ছে- ০৯১৮২৭৩৬৪৫৫৪৬৩৭২৮১৯০ । আবার, ১ সংখ্যাটিরও অসাধারণ প্যালিনড্রোমিক ম্যাজিক রয়েছে । শুধুমাত্র ১ দিয়ে তৈরি সমান সংখ্যক অঙ্কবিশিষ্ট দুটি সংখ্যার গুণফল সবসময় প্যালিনড্রোমিক হবে। যেমন- ১১x১১=১২১, ১১১x১১১=১২৩২১, ১১১১x১১১১=১২৩৪৩২১ ইত্যাদি। আবার এই ক্ষেত্রে প্যালিনড্রোমিক গুণফলগুলোর মধ্যেও একটা ম্যাজিক রয়েছে। গুনফল গুলি লক্ষ্য করলে দেখবেন দুই অঙ্কের সংখ্যার গুণফলের মাঝের সংখ্যা ২, তিন অঙ্কের সংখ্যার গুণফলের মাঝের সংখ্যা ৩, চার অঙ্কের সংখ্যার গুণফলের মাঝের সংখ্যা ৪ ইত্যাদি। এই পদ্ধতিতে প্যালিনড্রোম নয় এমন একটি মাত্র সংখ্যা পাওয়া গেছে যেটা হচ্ছে ২২০১, তবে এর ঘনফল কিন্তু একটি প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা। এছাড়া এরকম সংখ্যাও অনেক আছে যেগুলোর বর্গ হল প্যালিনড্রোম। যেমন- ১১-এর বর্গ ১২১, ২২-এর বর্গ ৪৮৪, ২৬-এর বর্গ ৬৭৬ ইত্যাদি। একইভাবে ৭, ১১, ১০১ ও ১১১ সংখ্যাগুলির ঘনফলও প্যালিনড্রোম সংখ্যা। সংখ্যা গুলি হল- ৩৪৩, ১৩৩১, ১০৩০৩০১ ও ১৩৬৭৬৩১। চতুর্থ পাওয়ারের কয়েকটি প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা হচ্ছে ১৪৬৪১, ১০৪০৬০৪০১, ১০০৪০০৬০০৪০০১ ইত্যাদি। কিন্তু এখনও পর্যন্ত পাঁচ পাওয়ারের কোন প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা পাওয়া যায়নি। প্যালিনড্রোম কিছু মৌলিক সংখ্যাও আছে । তিন অঙ্কের মৌলিক সংখ্যার মধ্যে ১৫টি সংখ্যা রয়েছে , যেমন ১০১, ১৩১, ১৫১, ১৮১, ১৯১, ৩১৩, ৩৫৩, ৩৭৩, ৩৮৩, ৭২৭, ৭৫৭, ৭৮৭, ৭৯৭, ৯১৯, ৯২৯। পাঁচ অঙ্কের সংখ্যার মধ্যে ৯৩টি প্যালনিড্রোম মৌলিক সংখ্যা রয়েছে । সাত অঙ্কের সংখ্যার মাঝে আছে ৬৬৮টি। তিনটি ক্রমিক সংখ্যার গুণ করলে প্যালিনড্রোম হয় মাত্র একটি ক্ষেত্রে, ৭৭x৭৮x৭৯=৪৭৪৪৭৪। পাঁচটি ক্ষেত্রে দুটি ক্রমিক সংখ্যা গুণ করলে প্যালিনড্রোম সংখ্যা পাওয়া যায়। যেমন ১৬x১৭=২৭২, ৭৭x৭৮=৬০০৬, ৫৩৮x৫৩৯=২৮৯৯৮২, ১৬২১x১৬২২=২৬২৯২৬২ এবং ২৪৫৭x২৪৫৮=৬০৩৯৩০৬ । আবার এমনও কিছু মজাদার ক্ষেত্র আছে যেখানে প্যালিনড্রোম দুটি সংখ্যা গুন করলে অপর দুটি প্যালিনড্রোম সংখ্যার গুণফলের সমান হয়। সেরকমই দু’চারটে উদাহরণ হচ্ছে - ১৪৪x৪৪১=২৫২x২৫২, ১২২৪x৪২২১=২১৪২x২৪১২, ১৩৩৪৪x৪৪৩৩১=২৩৩৫২x২৫৩৩২ ইত্যাদি।



প্যালিনড্রোম শব্দ ও বাক্যঃ


প্রাচীন ‘কিরাতার্জুনীয়’ কাব্যের বহু অনুচ্ছেদে প্যালিনড্রোমিক লেখা দেখা যায়। যেমন এই অনুচ্ছেদটিও একটি প্যালিনড্রোম যেটা শুরু বা শেষ থেকে পড়লেও একই রকম হয়- “সারস নয়না ঘন অঘ নারচিত রতার কলিক হর সার রসাসার রসাহর কলিকর তারত চিরনাঘ অনঘ নায়ন সরসা”।
চতুর্দশ শতকে দৈবজ্ঞ সূর্য পণ্ডিত ‘রামকৃষ্ণ বিলোম কাব্যম’ নামে ৪০টি শ্লোকের একটি বিখ্যাত কবিতা লিখেন যার প্রতিটি শ্লোকই এক-একটি প্যালিনড্রোম। আবার, এই অসাধারণ কবিতাটি শুরু থেকে পড়লে রাম ও রামায়ণের কাহিনি আর শেষ থেকে পড়লে কৃষ্ণ ও মহাভারতের কাহিনি পাওয়া যায়। যেমন ৩ নং শ্লোকে রয়েছে “তামসীত্যসতি সত্যসীমতা মায়য়াক্ষমসমক্ষয়ায়মা। মায়য়াক্ষমসমক্ষয়ায়মা তামসীত্যসতি সত্যসীমতা।”


বাংলা প্যালিনড্রোমঃ

বাংলায় প্যালিনড্রোমিক শব্দ প্রচুর আছে। দুই অক্ষরের প্যালিনড্রোমিক শব্দ হল- বাবা, দাদা, মামা, কাকা, চাচা, নানা, লালা, হিহি, জুজু ইত্যাদি। তবে তিন অক্ষরের প্যালিনড্রোমিক শব্দের সংখ্যাই বেশি। যেমন- মরম, মলম, দরদ, জলজ, যমজ, তফাত, মধ্যম, বাহবা, চামচা, সন্ত্রাস, সমাস, সহিস, নতুন, নবীন ইত্যাদি। একটু বড় প্যালিনড্রোমিক শব্দ হল বনমানব, নবজীবন। বাংলায় বেশ কিছু প্যালিনড্রোমিক নামও  রয়েছে  – মহিম, নরেন, কনক ইত্যাদি। পদবিসহ প্যালিনড্রোমিক নাম বিরল হলেও বাস্তবে আছে, যেমন- রমাকান্ত কামার, সুবললাল বসু, সদানন দাস, রায়মনি ময়রা, হারান রাহা, নিধুরাম রাধুনি, দেবী দে ইত্যাদি ।

তবে বাংলায় প্যালিনড্রোমিক বাক্য খুব বিরল। বাংলায় প্রচুর পরিমাণে যুক্তবর্ণ ও যুক্তাক্ষরের ব্যবহার হওয়ায় অর্থপূর্ণ প্যালিনড্রোমিক বাক্য গঠন করাও বেশ কষ্টসাধ্য। তবু সরল কিছু শব্দের সাহায্যে ছোট ছোটো প্যালিনড্রোমিক বাক্য গঠন করা অসম্ভব নয়। সীমার মাসী, ইভার ভাই, বই চাইব, ঘুরবে রঘু, তুমি কি মিতু, বিকল্প কবি, নাম লেখালেম না ইত্যাদি হলো প্রচলিত কিছু প্যালিনড্রোমিক বাক্য।


বাংলা প্যালিনড্রোমিস্টঃ

যারা এই ধরনের দ্বিমুখী শব্দ ও বাক্য সাজাতে দক্ষ তাঁদেরকে ‘প্যালিনড্রোমিস্ট’ বলা হয়। বাংলায় প্যালিনড্রোমিক শব্দ তৈরির অগ্রদূত হচ্ছেন দাদাঠাকুর নামে খ্যাত শরৎচন্দ্র পণ্ডিত। তিনিই সম্ভবত প্যালিনড্রোম নিয়ে গভীরভাবে চর্চা করা প্রথম বাঙালি । তার জন্মসাল ১৮৮১ সালটা একটা প্যালিনড্রোমিক বছর। তার জন্ম তারিখ বাংলা ১৩ বৈশাখ ১২৮৮ বঙ্গাব্দ । ১৩ বৈশাখকে সংখ্যায় লেখা হয় – ১৩/১। এটাও একটা প্যালিনড্রোম। তার মৃত্যু ও হয় একই  তারিখেই – ১৩ বৈশাখ। তিনি তাঁর ‘বিদুষক’ পত্রিকায় লেখালেখি করতে গিয়ে বহু প্যালিনড্রোম সৃষ্টি করে বাংলাভাষার প্যালিনড্রোমকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছেন। দাদাঠাকুরের সৃষ্ট অমর কিছু প্যালিনড্রোম হল- কেবল ভুল বকে; দাস কোথা থাকো সদা? ;  কাক কাঁদে কাক কাঁ; চেনা সে ছেলে বলেছে সে নাচে; তাল বনে নেব লতা; মার কথা থাক রমা; চার সের চা; বেনে তেল সলতে নেবে;  নিমাই খসে সেখ ইমানি; থাক রবি কবির কথা, রমা তো মামা তোমার; বিরহে রাধা নয়ন ধারা হেরবি।  বাংলাভাষার সর্বাধিক জটিল ও সর্বাধিক শব্দ সমন্বিত প্যালিনড্রোম হচ্ছে তাঁর সৃষ্ট ‘কীর্তন মঞ্চ পরে পঞ্চম নর্তকী’ ।
তার লেখা একটি প্যালিনড্রোম কবিতা হল-
"রাধা নাচে অচেনা ধারা
রাজন্যগণ তরঙ্গরত, নগণ্য জরা
কীলক-সঙ্গ নয়নঙ্গ সকল কী?
কীর্তন মঞ্চ ‘পরে পঞ্চম নর্তকী"
অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এই কবিতার প্রতিটি লাইনই এক একটি প্যালিনড্রোম!

লেখাঃ সাইমুম সালেহীন