বাংলাদেশের কিছু হাড় হিম করা ভূতুড়ে স্থান
অন্যান্য দেশের মতো ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এ দেশেও রয়েছে অসংখ্য রহস্যাবৃত ভুতুরে জায়গা, যার কোনো কোনোটি সম্পর্কে অবগত থাকলেও বেশিরভাগ জায়গাগুলো সম্পর্কে আমরা তেমন কিছুই জানিনা। আজ এরকমই কিছু রহস্যময় স্থান সম্পর্কে জানবো যেগুলোর রহস্য আজ পর্যন্ত কেউই ভেদ করতে পারে নি।
বগা লেকঃ অনেক অনেক দিন আগে একটি চোঙা আকৃতির পাহাড় ছিল। দুর্গম পাহাড় ঘন অরণ্যে ঢাকা। পাহাড়ের কোলে বাস করত নানা নৃগোষ্ঠীর মানুষ। ম্রো, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা প্রভৃতি। সেই পাহাড়ের নিকটবর্তী গ্রামগুলো থেকে প্রায়ই গবাদিপশু আর ছোট শিশুরা ওই চোঙ্গা আকৃতির পাহাড়টিতে হারিয়ে যেতো! অতিষ্ঠ গ্রাম থেকে সাহসী যুবকদের দল এর কারণ অনুসন্ধানে গিয়ে দেখতে পায়, সেই পাহাড়ের চূড়ার গর্তে এক ভয়ঙ্কর বগা বাস করে। বম ভাষায় বগা মানে ড্রাগন। তারা কয়েকজন মিলে ড্রাগনটিকে হত্যা করে ফেলে। ড্রাগনটির মৃত্যুর সাথে সাথে ড্রাগনের গুহা থেকে ভয়ঙ্কর গর্জনের সঙ্গে আগুন বেরিয়ে এসে পুড়ে দেয় আশপাশ। নিমিষেই সেই পাহাড়ের চূড়ায় মনোরম একটি পাহাড়ি লেকের জন্ম হয়। আর সেটিই হলো বোগা লেক। তবে বগালেকের সৃষ্টি রহস্য নিয়ে বাংলাদেশের ভূ-তত্ত্ববিদগণ মনে করেন বগালেক মূলত মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ।
গানস অফ বরিশালঃ অষ্টাদশ শতাব্দির শেষের দিকে তখনকার পূর্ববাংলার দক্ষিনাঞ্চালে এক ধরনের বিকট এবং আজব ধরনের শব্দ শোনা যেতো। তার নাম করন করা হয় বরিশাল গানস অথবা গানস অফ বরিশাল। এই ধরনের শব্দকে বলা হয় মিস্টপুফার্স। শব্দের আকার ছিলো অনেক বড়। শব্দটা কিছুটা কামানের শব্দের মত শুনতে ছিল। কিন্তু আজব ব্যপার হলো কেউই কোন দিন এই শব্দের উৎস সম্পর্কে জানতে পারেনি। নথিপত্রে বরিশাল গানসের কথা প্রথমে উল্লেখ করা হয় ১৮৭০ সালে। ১৮৮৬ সালে কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটি তথ্য অনুযায়ী বরিশাল সহ খুলনা, নোয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ, হরিশপুর ইত্যাদি অঞ্চলে গানস অফ বরিশাল এর বিকট শব্দ শোনা গেছে। মাঝে মাঝে একটি শব্দ শোনা যেতো আবার কখনো বা দুইট বা তিনটি শব্দও শোনা যেতো। শব্দগুলো বেশি শোনা যেতো দক্ষিন ও দক্ষিন-পূর্বাঞ্চল থেকে। বিশেষ করে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে শব্দগুলো বেশি শুনতে পাওয়া যেতো। ব্রিটিশরা প্রথমে ধারনা করেছিলো জলদস্যুদের কামানের আওয়াজ কিন্তু তারা কোথাও জলদস্যুদের জাহাজ কিবং তাদের ঘাঁটি খুজে পান নি। ঊনবিংশ শতকে গানস অফ বরিশাল ব্যপক তোলপার সৃষ্টি করে। পরে তার আরো কিছু অনুমান করেছিলেন কিন্তু তার কোনটাই আজও প্রমান করা সম্ভব হয় নি। এখনও সেই শব্দ একটি রহস্য হয়ে থেকে গেছে।
চিকনকালাঃ চিকনকালা বা নিফিউ পাড়া আসলে একটি মুরং গ্রাম। বাংলাদেশ- মিয়ানমার সীমান্তে নো ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থিত সবচেয়ে উঁচু ও দুর্গম একটি গ্রাম চিকনকালা। জিপিএস এর হিসেব মতে, প্রায় ২৭০০ ফুট উপরে অবস্থিত চমৎকার এই গ্রামটিকে দেখলে মনে হয় পৃথিবীর বাইরের কোন জায়গা। চিকনকালা গ্রামটিকে ঘিরে প্রচলিত আছে নানা মিথ বা আদিভৌতিক কাহিনী। এই গ্রামের মানুষের মতে প্রতিবছরই হঠাৎ কোন একদিন কোন জানান না দিয়ে বনের ভেতর থেকে বিচিত্র একটা ধুপধাপ আওয়াজ আসতে থাকে। এ আওয়াজ শুনলেই গ্রামের শিশু বৃদ্ধ সবাই আতংকিত হয়ে পড়েন। সবার ধারণা, কোন পিশাচ করে এই আওয়াজ। এই শব্দ শোনামাত্র বনের ভেতরে থাকা কাঠুরে বা শিকারীরদল উর্ধশ্বাসে জান হাতে নিয়ে ছুটে বন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রতিবছরই তাদের এক-দু’জন পিছনে রয়ে যায়। তারা আর কোন দিন গ্রামে ফিরে আসে না। ক-দিন পরে হয়তো জঙ্গলে তাদের মৃতদেহ আবিষ্কার হয়। সারা শরীরে কোন আঘাতের চিহ্ন নেই। শুধু চেহারায় থাকে ভয়ঙ্কর আতঙ্কের ছাপ। কিন্তু কি দেখে ভয় পেয়েছে, আর কিভাবে কোন ক্ষতচিহ্ন ছাড়া মারা গেছে, সেই রহস্য এখনো চিকনকালার লোকেরা ভেদ করতে পারেনি। এছারাও অনেকে এই গ্রামে মৃত চিতাবাঘের ছাল পাওয়ার বা দুপুর ১২টায় বুনো দাঁতালো শুকর, ময়ূর দেখার বা দিনের বেলাতেই বার্কিং ডিয়ার আর ভাল্লুকের ডাক শুনেছে বলে দাবি করে।
সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডঃ “নো গ্রাউন্ড” মানে অতল স্পর্শী। রহস্যময় এ খাতকে বহু আগে ব্রিটিশরা “সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড” নামে আখ্যায়িত করে। এর কারণ হলো সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড যেখানে শুরু সেখানে হঠাৎ করেই পানির গভীরতা বেড়ে গেছে। এটি খাদ আকৃতির সামুদ্রিক অববাহিকা বা গিরিখাত, যা বঙ্গোপসাগরের মহীসোপানকে কৌণিকভাবে অতিক্রম করেছে। এটি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত। গঙ্গা খাদ নামেও এটি পরিচিত। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের আরও কিছু বদ্বীপ-মুখী খাদ দেখতে পাওয়া যায়। সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের প্রস্থ ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার, তলদেশ তুলনামূলক ভাবে সমতল এবং পার্শ্ব দেয়াল প্রায় ১২ ডিগ্রি হেলানো। মহীসোপানের কিনারায় খাদের গভীরতা প্রায় ১,২০০ মিটার। ধারণা করা হয়, বঙ্গোপসাগরের নিচে কান্দা ও উপ-বদ্বীপ উপত্যকার আকারে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড সাগর অভিমুখে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার সম্প্রসারিত হয়ে আছে। সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের দিকে মুখ করে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের মোহনার কাছে বালুচর ও শৈলশিরার অবস্থিতি এই ইঙ্গিতই বহন করে যে, এই খাদ দিয়েই পলল বঙ্গোপসাগরের গভীরতর অংশে বাহিত হয়। সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের উৎপত্তি নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে। অবশ্য সাধারণভাবে মনে করা হয়ে থাকে যে, সোপান প্রান্ত ও সোপান প্রান্তের ঊর্ধ্ব ঢালে উৎপন্ন ঘোলাটে স্রোত ও নদী-প্রবাহের সম্মিলিত প্রভাব সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড গঠনের জন্য দায়ী।
লালবাগ কেল্লার সুড়ঙ্গঃ বাংলাদেশের মানুষের কাছে খুবেই পরিচিত একটি দুর্গ লালবাগ কেল্লা। ছোট বেলা থেকেই বইপত্রে বিভিন্ন সময় লালবাগের অনেক ইতিহাস পড়তে পড়তে বড় হয়েছেন। কিন্তু এই লালবাগ নিয়ে আছে অনেক রহস্য যা অনেকেই জানেন আবার অনেকেই জানেন না। শোনা যায় লালবাগ কেল্লায় নাকি এমন একটি সুড়ঙ্গ আছে যার ভেতরে কেউ প্রবেশ করে আজ পর্যন্ত ফেরত আসতে পারেনি। লালবাগ কেল্লার নিচ দিয়ে অনেকগুলো সুড়ঙ্গ আছে, যেগুলো জমিদার আমলে করা। জমিদাররা বিপদ দেখলে সেই সব পথে পালিয়ে যেতেন। তেমনই একটা সুড়ঙ্গ আছে, যার ভেতরে কেউ ঢুকলে তাকে আর ফিরে পাওয়া যায় না। পরীক্ষা করার জন্য একবার ২টা কুকুরকে চেইনে বেঁধে সেই সুড়ঙ্গে নামানো হয়েছিলো। চেইন ফেরত আসে কিন্তু কুকুর দুটো ফিরে আসে নি। সুড়ঙ্গটি মোঘল আমলে বানানো হয়। তখন এটি এখন যেমনটা দেখা যায় তেমনটা ছিলনা। শোনা যায়, কিছু বিদেশী বিজ্ঞানীরা গবেষণা করার জন্য কুকুর পাঠায়, কিন্তু সে কুকুর আর ফিরে আসেনি! পরে তারা চিন্তা করে শেকল দিয়ে বেধে কুকুর পাঠায়, কিন্তু সেখানে কুকুরের শিকল আসলেও কুকুরের চিহ্ন পাওয়া যায়নি! কারো কারো মতে, এখানে এমন এক গ্যাস আছে যাতে প্রাণীর মাংস খসে গলে যায়, কারো মতে এখানে এমন এক ভয়ংকর শক্তি আছে যার কারণে কেউ প্রবেশ করলে আর ফিরে আসবে না! আর একটা কথা, এখানে এতটাই অন্ধকার যে কোন লাইট বা আলো কাজে আসেনা। এখন এটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কেউ যদি কেল্লায় যান তবে পাহাড়ের উপরে উঠলেই দেখতে পাবেন।

Post a Comment