বাংলা নামকরণের ইতিহাস
প্রাণের দেশ বাংলাদেশ! সুমধুর বুলি আমাদের বাংলা ভাষা। এই বাংলা নামের দেশটির জন্য আমরা যুদ্ধ করেছি, শিরার খুন ঝড়িয়ে পেয়েছি বাংলা ভাষা। আচ্ছা, কখনো কি ভেবে দেখেছি কোথা থেকে এলো এই "বাংলা" শব্দটি! হয়ত বা কারো কৌতুহলী মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে । বাংলা নামকরণের ইতিহাস নিয়ে হয়েছে অনেক গবেষণা। চলুন একটু ঘুরে আসি বাংলা নামকরণের সেই অজানা ইতিহাস থেকে।
মূলতঃ মুসলিম আমল থেকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের বসবাসের অঞ্চলকে বাংলা বলা হয়। এখন পর্যন্ত পাওয়া ঐতিহাসিক তথ্যমতে বাংলা শব্দটি এসেছে বঙ্গ শব্দ থেকে। তবে এই বাংলা বা বঙ্গ শব্দটি কিভাবে উৎপত্তি হয়েছে এই নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট মত পার্থক্য রয়েছে। সেই মত গুলিই এখন আমরা জানবো।
১. হিন্দু শাস্ত্র মতে
মহাভারত, পুরাণ, হরিবংশ ইত্যাদি অনুযায়ী প্রাচীন কালে ভারতবর্ষে একজন রাজা ছিলেন যার নাম ছিল বলী রাজা। বলী রাজার ছিল ৫ সন্তান। এদের নাম ছিল - অঙ্গ, বঙ্গ,কলিঙ্গ, পুন্ড্র ও সূক্ষ্ম। বলী রাজা তার পাঁচ পুত্রকে পাঁচটি রাজ্যের রাজা করেন। সেই পুত্র দের নামেই পরবর্তীতে তাদের রাজ্যের নামকরণ হয়। বঙ্গ নামের পুত্রটি পায় এই অঞ্চল এবং তার নামেই রাজ্যের নাম হয় বঙ্গ।
২. মুসলিম মতে
মুসলিম শাসনামলে গোলাম হোসাইন সালিম নামক একজন ঐতিহাসিক রিয়াজুস সালাতিন নামে একটি গ্রন্থ লেখেন ।সেখানে বলা হয়,হযরত নূহ আঃ এর পুত্র হাম বসবাসের জন্য পৃথিবীর দক্ষিণ অঞ্চলে আসেন।হামের ৬ পুত্রের একজনের নাম ছিল হিন্দ। হিন্দ সর্বপ্রথম এই অঞ্চলে বসবাস শুরু করলে তার নামানুসারে উপমহাদেশের নাম হয় হিন্দুস্তান। হিন্দের চার পুত্রের একজনের নাম ছিল বঙ্গ এবং তিনি বাংলা অঞ্চলে বসবাস শুরু করায় এ অঞ্চলের নাম হয় বঙ্গ। পরবর্তীতে আল শব্দ যুক্ত হয়ে নাম হয় বঙ্গাল বা বাঙ্গালা।
৩. অন্যান্য মত : (ক)
অধ্যাপক আখতার ফারুক তার বাঙ্গালির ইতিকথা বইয়ে গঙ্গরীডী নামক এক জাতীর উল্লেখ করেন।তিনি বলেন গঙ্গ শব্দ থেকে বঙ্গ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। প্রাচীনকালে গঙ্গরীডী নামক একটি দুর্ধর্ষ জাতি এই অঞ্চলে বসবাস করতো। তাদের সাম্রাজ্য কামরুপ থেকে পাঞ্জাবের পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।তাদের নামানুসারে এর নাম হয় গঙ্গ। ক্রমে আর্যভাষা ও উচ্চারণ রীতির প্রভাবে তা বঙ্গে পরিণত হয়।
৪. অন্যান্য মত : (খ)
সম্রাট আকবরের সভাসদ ও ঐতিহাসিক আবুল ফজল তার আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে বাংলা নামকরণ সম্পর্কে বলেছেন। তিনি বলেন, প্রাচীন কালে এ অঞ্চলের নাম ছিল বঙ্গ।তখন এখানের রাজারা ১০ হাত উচু ও ২০ হাত প্রশস্ত উচু আইল বা আল বেধে কৃষিজমির সুরক্ষা নিশ্চিত করতো।এই আল হচ্ছে এক ধরনের বাধ।এটা দেয়া হত যেন বন্যার পানি ফসলের ক্ষতি করতে না পারে। সময়ের ব্যবধানে আল শব্দটি বঙ্গের সাথে যুক্ত হয়ে বঙ্গাল বা বাঙ্গাল এ পরিণত হয়।
৫. অন্যান্য মত : (গ)
কিছু ইতিহাসবিদের মতে এই অঞ্চলের আদিম জনগোষ্ঠী বোঙ্গা নামে এক দেবতার পূজা করতো।তার নাম থেকেই বঙ্গ নামটির উদ্ভব হয়। বঙ্গ বা বঙ্গাল থেকে বাঙ্গালা।
(১)মুসলিম শাসনের প্রথম দিকে সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ এর আমলে জিয়াউদ্দীন বারাণী নামক একজন লেখক তারিখ-ই-ফিরোজশাহী নামে একটি বই লিখেন।তিনি সেখানে প্রথম বারের মত বাঙ্গালাহ শব্দটি ব্যবহার করেন। ইলিয়াস শাহ কে শাহ-ই-বাঙ্গালাহ বা সুলতান-ই-বাঙ্গালাহ বলে উল্লেখ করেন। ইতিহাসের এখানে এসেই আমরা প্রথমবারের মত বঙ্গ থেকে বাংলা হওয়ার দলিল পাই।
(২) ইংরেজ শাসনামলে বঙ্গ অঞ্চলকে ইংরেজরা বলতো বেঙ্গল (Bengal)। এবং ধারনা করা হয় বেঙ্গল থেকেই ক্রমশ বাংলা নামের উৎপত্তি হয়। অন্যান্য ঐতিহাসিক উপাত্ত চতুর্থ শতক থেকে শুরু করে গুপ্ত যুগ, গুপ্ত পরবর্তী যুগ, পাল-সেন প্রভৃতি আমলের শিলালিপিও সাহিত্য কর্মে প্রাচীন বঙ্গ জনপদের নাম পাওয়া যায়। হিন্দু শাস্ত্রকার বোধায়নের লেখা ধর্মসুত্র নামক গ্রন্থে কলিঙ্গ জনপদের প্রতিবেশি হিসেবে বঙ্গ জনপদের উল্লেখ আছে। মহাভারতের আদি পর্বেও বঙ্গ জনপদের উল্লেখ আছে। মহাকবি কালীদাসের রঘুবংশ কাব্যে ভাগিরথী ও পদ্মার স্রোতের অন্তর্বর্তী এলাকাকে বঙ্গ জনপদের অবস্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মোটামুটি এই ছিল বাংলা বা বঙ্গ অঞ্চলের নামের ইতিহাস। এত গুলি মতের মধ্যে যে আসলে কোনটি সঠিক তা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। এর পূর্বে এই অঞ্চলের নাম কি ছিল এরকম কোন দলিল প্রমাণ বা তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

Post a Comment