প্রেমের একাল সেকাল


প্রেম মহাসৃষ্টি। প্রেমের জন্যেই টিকে আছে এই ধরিত্রী। প্রেম অতীতেও ছিলㅡআছেㅡচিরকাল থাকবে। সময়ের সাথে সাথে অন্যান্য সবকিছুর মতো প্রেমও হয়ে চলছে পরিবর্তিত ও মার্জিত। কিন্তু বর্তমানে প্রেমের এই পরিবর্তিত রূপ অতীতের প্রেমগুলো থেকে কতটা উৎকৃষ্ট ও গভীর বলতে পারেন?

আমরা সবাই জানি, আগেকার দিনে প্রেমের জন্য যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে চিঠির ব্যবহার হতো। ডাকপিয়ন হিসেবে নিয়োজিত থাকতো এলাকারই ছোট ছোট ভাই কিংবা বোন। অনেকের মতে চিঠির যুগের প্রেম-ভালবাসাগুলোই খাঁটি ছিল। আমিও এর সাথে একমত! চিঠিতে লিখা কলমের কালির প্রতিটি অক্ষরে যেন একটা নেশা ধরানো আকর্ষণ থাকত। এই চিঠির জন্য অপেক্ষার প্রহর ভেঙ্গে ভেঙ্গে অবশেষে যখন কাঙ্খিত চিঠিটি হাতে আসতো ধুকপুকানি বুকের প্রেম-স্পন্দন যেন বহুগুণে বেড়ে যেত। কিন্তু এই স্পন্দন কি আজকালকার ক্ষুদ্র ডিভাইসের ক্ষুদে বার্তায় মেটানো সম্ভব?

শুনেছি সেকালে প্রেমিক-প্রেমিকারা একসাথে খোলা আকাশের নিচে বসে চাঁদ দেখার মাঝে ভালোবাসা খুঁজে নিত। জোৎস্নার আলোয় প্রেমিকাকে যখন অপ্সরীর মতো দেখতে লাগতো প্রেমিক তখন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে যেত অচিরেই। আর এখন তো স্কাইপি, ইমো'র পর্দায় ভেসে ওঠা প্রেমিকার চেহারা দেখে হুমড়ি খেয়ে পড়ার চেষ্টা করে বারে বারে। তবুও পারে না।

আসলে সত্যিকারের প্রেম হলো একটা সুদৃঢ় বন্ধন। উভয়ের থেকে দূরে থাকলেও সত্যিকারের প্রেমের বন্ধন কখনও ছিঁড়ে যায় না; কখনো শিথিল হয় না। বলাবাহুল্য যে, এখনকার প্রেম-ভালবাসার সম্পর্কগুলো তৈরীই হয় ভেঙ্গে যাওয়ার জন্য। কারণ, আজকালকার ছেলেমেয়েদের কাছে এটা একটা ফ্যাশন, এক ধরনের বিলাসিতা হিসেবে মনে করে এটাকে। তারা প্রেমে পড়ে গিয়ে প্রেম করে না বরং প্রেম করার জন্যই প্রেমে পড়ে। আমার বন্ধুরা করেㅡআমাকেও করতে হবে। এই ধরনের চিন্তা-ভাবনাগুলো সত্যিকার অর্থেই সত্যিকারের ভালবাসার স্বাদ নিতে দেয় না।

প্রেমটা যদি এতোই তুচ্ছ হতো তাহলে আদিকালের মানুষরা প্রেমে পড়ে অন্ধ হয়ে যেত না। যে অন্ধত্বের কবলে পড়ে বৃটেনের রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড ত্যাগ করেছিলেন তার সাধের রাজ্যㅡলাইলি-মজনু, রহিমা, আছিয়া, শিরি-ফরহাদ হয়েছিলেন দিশেহারা। এরকম অনেক অমর ভালবাসা দৃষ্টান্ত হয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল।
কিন্তু একালের প্রেম-ভালবাসাগুলোর দিকে তাকালে মনে হয় যেভাবে "ফল ইন লাভ"ㅡ"ব্রেকিং আপ" হচ্ছে কাউকে আর কষ্ট করে প্রেমের জন্য মরে গিয়ে দৃষ্টান্ত তৈরী করতে হবে না, প্রেমই একদিন মরে গিয়ে মানবজাতির জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রইবে।

সত্যি কথা বলতে কি, প্রযুক্তির সাথে সাথে প্রেমটাও এখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। চিঠির জন্য অপেক্ষা করে করে এখন অনুভূতিগুলোকে আর বাড়তে দেওয়া হয় না। এখন আর প্রিয়তমার প্রেরিত বার্তাগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ার সময় নেই। কে কত তাড়াতাড়ি টেক্সট করতে পারে তার উপরই প্রেমের আয়ুষ্কাল নির্ভর করে। টেক্সট করতে দেরী হলেই সন্দেহ, আর সন্দেহ হলেই ফেইসবুকে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস চেইঞ্জড টু সিঙ্গেল। এই গতির যুগে প্রেমও এতোটাই গতিশীল হয়ে গেছে যে, প্রেমিক-প্রেমিকারা এখন আর দৌড়েও প্রেমের নাগাল পায় না।

এ যুগের প্রেমে কোন পাগল করা কষ্ট নেই। কষ্টের সুখে ভেসে ভেসে সুখানুভূতিগুলোও শূন্য হয়ে গিয়েছে। এখনকার প্রেমিকরা আর কবি হয়ে ওঠে না কারণ কবিতার যাদুতে বেঁধে রাখার যুগ এখন আর নেই। তবে এতোসব ভালো মন্দের মধ্যেও অসংখ্য প্রকৃত ভালবাসা আছে। আর আছে বলেই পৃথিবীটা এখনো এতো সুন্দর।

কবি সাহিত্যিকরা বলেছেন, "প্রেম আর প্রকৃতি একসূত্রে গাঁথা।" প্রেমকে প্রকৃতি থেকে আলাদা করে যান্ত্রিক করে ফেললে প্রেম থাকবে; কিন্তু প্রেমের প্রাণ থাকবে না। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা দিন দিন যতই বাড়ুক না কেন সত্যিকারের প্রেম ও অনুভূতিগুলো পড়ে রইবে সেই লাল-নীল রঙা খামের ভেতরেই।